৪ এপ্রিল, ২০২৫ | ২১ চৈত্র, ১৪৩১ | ৫ শাওয়াল, ১৪৪৬


শিরোনাম
  ●  পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় এসএসসি’১৮ ব্যাচের ইফতার মাহফিল সম্পন্ন   ●  উখিয়া সমাজসেবা কর্মচারীর নামে বিধবা ভাতা’র টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ   ●  ‘পটভূমি পরিবর্তনের জন্য সাংবাদিকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য’ – সরওয়ার জাহান চৌধুরী   ●  উখিয়ার বরণ্য রাজনৈতিক মৌলভী আবদুল হকের ১৯ তম মৃত্যু বার্ষিকী ২০ মার্চ   ●  হাসিঘর ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার সিজন-১ এর ফল প্রকাশিত   ●  মিরসরাই প্রেসক্লাবের ইফতার ও সুধী সমাবেশ   ●  বন কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকির ভিডিও ভাইরাল, নিরাপত্তা চেয়ে জিডি   ●  টেকনাফে ১০০০ জেলে পরিবারকে সহায়তা করছে কোস্ট ফাউন্ডেশন   ●  আল-নুর ইন্টান্যাশনাল মাদ্রাসা’র বই বিতরনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন   ●  টেকনাফে গহীন পাহাড়ে বন্যহাতির রহস্যজনক মৃত্যু!

একজন কুশলায়ন মহাথেরো

জগতে মানুষের জীবনকাল সীমাবদ্ধ। এই সীমাবদ্ধ জীবনকে সার্থক এবং পরিপূর্ণ করার লক্ষ্যেই পূণ্যপুরুষগণ ত্যাগের পথ বেছে নেন। কারণ, ত্যাগের পথ ধরেই জীবনকে অর্থবহ ও সার্থক করে তুলতে হয় এবং সার্থক জীবনের মাধ্যমেই অাত্নহিত ও পরহিত সাধন করা সম্ভব। তবেই মানুষ হয়ে উঠে সৃষ্টির সেরা জীব। সঙ্গত কারণেই জীবশ্রেষ্ঠ মানব জীবন সম্পর্কে বৌদ্ধ সাহিত্যে বলা হয়েছে জগতে মানব জীবনই বড় দুর্লভ। এই জীবনের মাধ্যমেই মানুষকে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হয়। আবার মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় তার জীবনকর্মের মাধ্যমে। তাই বলা হয় জীবন কর্মই মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং এইরূপ শ্রেষ্ঠ ধর্মের পরিচয় প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসে হয়না, হয় মানুষের জীবনকর্মে। তাই এই ধর্মবোধে উদ্বুদ্ধ হয়েই পুণ্যপুরুষগণ পরের কল্যাণে নিজেকে সমর্পন করেন।

ঠিক এইরকমই একজন ত্যাগদীপ্ত পুণ্যপুরুষ, শাস্ত্রজ্ঞ, লেখক, দেশক, প্রচারক, সমাজ সংস্কারক ও দক্ষ সংগঠক হলেন বিনয়ভূষণ শ্রীমৎ কুশলায়ন মহাথেরো। যার আদর্শকে আমরা লালন করছি। তিনি বর্তমানে ভিক্ষু সমাজ সংগঠিত রাখার পাশাপাশি উখিয়ায় সুশীল সমাজ বিনির্মাণে এবং জোরালোভাবে সমাজের কুসংসকার অপনোদন ও ধর্মীয় চেতনায় দায়কসমাজকে উদ্বুদ্ধকরনে অক্লান্ত প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।

শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড এই আদর্শে তিনি অত্র এলাকায় নানাভাবে শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখছেন। তিনি বহু গরীব ও মেধাবী সন্তানকে নিজের প্রতিষ্ঠিত “জ্ঞানসেন বৌদ্ধ ভিক্ষু – শ্রামণ প্রশিক্ষণ ও সাধনা কেন্দ্র” নামক প্রতিষ্ঠানে রেখে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করেন, তাদের মধ্যে অনেকে বর্তমানে সরকারের প্রশাসনিক বিভাগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত। পাশাপাশি তিনি উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে গড়ে তুলেছেন অনেক জ্ঞানী-গুণী ভিক্ষু সংঘ যারা বর্তমানে দেশ বিদেশে বিভিন্ন প্রিতষ্ঠানে রয়েছেন।

পাশাপাশি তিনি নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বরইতলী নামক গ্রামে ধর্ম ও শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া উপজাতিদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন “বরইতলী উচ্চ বিদ্যালয়”। উল্লেখ্য উক্ত এলাকায় কোন উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় অনেক সন্তানেরা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার পর ঝড়ে পড়তেন। তাদের লেখাপড়ার আর কোনো সুযোগ থাকতোনা। প্রতিষ্ঠান গড়ার পাশাপাশি তিনি গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য আর্থিক সাহায্য ও প্রদান করে আসছেন। অত্র উখিয়া উপজেলার অনেক ছাত্র ছাত্রী পূজনীয় ভন্তের আর্থিক সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত আছেন। আবার অনেকেই ছাত্রজীবন শেষ করে চাকুরীজীবনে রয়েছেন।

তিনি যে বিহারে অবস্থান করছেন সে বিহারটির নাম হলো ” শৈলেরঢেবা চন্দ্রোদয় বৌদ্ধ বিহার”। উনার আগমনের পরপরই উনার ত্যাগদীপ্ত জীবনের নিরলস প্রয়াসেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ভিক্ষু সীমা ও সুসজ্জিত সীমাঘর, বিহার চত্বরের প্রাচীর নির্মাণ, তোরণ নির্মাণ, বিহারের অবস্থান ভিক্ষু, শ্রামণ ও শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠাগার। নিমার্ণ করতে চলেছেন মনোরম বিহার যার নিচের তলায় অগ্র মহাপন্ডিত প্রজ্ঞালোক ও প্রজ্ঞাবংশ সেমিনার হলের কাজ সুসম্পন্ন হয়েছে। যেটি কক্সবাজার জেলার অন্যতম দৃষ্টিনন্দন সেমিনার হল। ২য় তলার নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। পুজনীয় ভন্তের স্বপ্ন হলো এই বিহারটিকে বৌদ্ধ তীর্থরূপ দিয়ে দৃষ্টিনন্দন করে সাজানো। সেই লক্ষ্যেই তিনি বিহারের মধ্যে সংঘরাজ জ্যোতিপাল ভবন নামে দ্বিতল বিশিষ্ট ভিক্ষু নিবাস, ভোজনালয়, দ্বিতল বিশিষ্ট ভবনে বিদ্যালয় স্থাপন, উপগুপ্ত ভন্তের চুড়া নির্মাণ, থাই স্ট্যাইলে আরো একটি চুড়ার নির্মাণকাজ চলমান, বোধি গাছের চতুর্পাশে সুন্দর বেস্টনীদ্বারা দৃষ্টিনন্দন বোধিবিহার তৈরীসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ চলমান রেখেছেন।

পাশাপাশি উনার পৃষ্টপোষকতায় ” জ্ঞানসেন বৌদ্ধ ভিক্ষু – শ্রামণ প্রশিক্ষণ ও সাধনা কেন্দ্রের” সম্পাদনায় পূজনীয় ভন্তে ও উনার শিষ্যদের লেখা এবং অনুবাদকৃত বহু ধর্মীয় গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যা ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক।

অবস্থানরত পিছিয়ে পড়া গ্রামকে শিক্ষা – দীক্ষায় অগ্রসর করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ” কুশলায়ন কিন্ডার গার্টেন”। যেখানে অত্যন্ত স্বল্প খরচে অভিভাবগণ তাদের সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার সুযোগ পাচ্ছেন। গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন বিশেষ সুযোগ সুবিধা।

উখিয়া তথা কক্সবাজার জেলায় ধর্মীয় শিক্ষার মানোন্নয়নে তিনি দীর্ঘকাল যাবত ” শাসনবংশ প্রভাতী সদ্ধর্ম শিক্ষা নিকেতন ধর্মীয় বৃত্তি” পরীক্ষা চালু করে চালিয়ে যাচ্ছেন। যেখান থেকে প্রতি বছর ৩য় থেকে ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা হয়। যার সুফল আমরা ভোগ করছি। আমাদের নবপ্রজন্ম বর্তমানে ধর্মীয় শিক্ষায় অনেক অগ্রসর।

শাসন সদ্ধর্মের সংস্কার সাধন ও আমাদের এই ঘুণেধরা সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া এবং ধর্মীয় আচার আচরণ অনুসরণ করার ক্ষেত্রে সমাজের মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণ এবং প্রতি শুক্রবার সকালে যাতে বৌদ্ধ ছেলে মেয়েরাসহ দায়কদায়িকারা বিহারে গিয়ে সমবেত প্রার্থনা ও ধর্ম শিক্ষা গ্রহণ করে তার জন্য ভন্তের উদ্যোগে কতিপয় ব্যাক্তিসহ ভন্তে উখিয়ার বিভিন্ন বিহারে সবাই উদ্বুদ্ধকরণ সভা করেছিলেন যার সুফল এখন বৌদ্ধ সমাজ পাচ্ছে। বর্তমানে উখিয়ার প্রায় বিহারে শুক্রবার সকালে শিশুরা বিহারে গিয়ে সমবেত প্রার্থনা ও ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করছে।

পাশাপাশি উনার প্রতিষ্ঠিত সকল প্রতিষ্ঠান, গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান কার্যক্রম, পুজনীয় ভিক্ষু-সংঘ ও দুস্থ লোকদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান, ধর্মীয় গ্রন্থ প্রকাশে আর্থিক সহায়তা দানসহ বিবিধ ধর্মীয় ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড বেগবান করার লক্ষ্যে তিনি ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন ” বিশ্বজ্যোতি মিশন কল্যাণ ট্রাস্ট” যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত। উপরোল্লেখিত বিবিধ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও উন্নয়ন এবং সহায়তামূলক প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা এই ট্রাস্ট বহন করে আসছে। এই ট্রাস্ট গঠনে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তিনি একটি নক্ষত্রের মতো উনার তৈরী চন্দ্রতুল্য অনেক শিষ্য প্রশিষ্যদের আলো দিয়ে যাচ্ছেন, যার আলোয় আজ আলোকিত উখিয়া তথা বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমাজ।

শ্রীমৎ কুশলায়ন মহাথেরো একজন প্রচারবিমুখ, নিভৃতচারী,স্বপ্নবিলাসী, নির্ভেজাল, নির্লোভী, মিষ্টভাষী, সাদা মনের এবং অহঙ্কারবিহীন ব্যাক্তিত্ব। একজন সত্যিকারের আদর্শবান ও অনুকরণীয় বৌদ্ধ ভিক্ষু। সমাজ ও সদ্ধর্মের উন্নয়নে তিনি নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।সমকালীন সময়ের সংঘ সমাজের নন্দিত সাংঘিক ব্যাক্তিত্ব হিসেবে কক্সবাজার অঞ্চলকে তিনি যেভাবে ধর্ম ও বিনয়ের সাথে সংগতি রেখে পরিচালিত করছেন তা বাতিঘররূপে এ অঞ্চলের প্রয়াত সকল
পূণ্যপুরুষগণের ন্যায় স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবেন।

লেখকঃ
মেধু কুমার বড়ুয়া, 
সহকারি শিক্ষক,
উখিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।